A Latest Crime Report Bengali Newspaper
বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইংরেজি, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

“শিল্প চৈতন্য বোধে হতদরিদ্র মদন কুমার বিদ্যাচর্চার এক সংগ্রামী নায়ক”

FB_IMG_1493581452116


নজরুল ইসলাম তোফা : হতদরিদ্র বাবার ছেলে এই মদন কুমার দাস ছোট্ট মাটির ঘরে জরাজীর্ণ খড় মিশ্রিত পুরনো ছিদ্র বিশিষ্ট টিনের ছাওনীতে বসবাস করে। বৃষ্টি এলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। কত রাত যে কষ্টে বসে কাটিয়ে হিসাব নেই। বাড়ির সামান্য এই পৈত্রিক ভিটা ছাড়া আর কোন সম্পদ তার নেই। সন্ধ্যা হলে আজও অন্ধকারে রাত্রি যাপন করতে হয়। কেরোসিন তেলে প্রদীপ জ্বালানোর অর্থ শেষ হলে পেটে দু’বেলা ভাত হবে না তার।
একদিকে তার শিক্ষা অর্জনের চরম আশা আকাংঙ্খা অন্য দিকে রয়েছে সূচনীয় পরিবারে বিশাল দারিদ্রতা। স্কুল শিক্ষকের এক ধরনের অনুপ্রেরণা এবং কিছু আর্থিক সহযোগিতায় স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছিল পক্ষান্তরে প্রতিনিয়ত স্কুলে যেতে পারতো না দিনমজুরি দিত বলে। লেখা পড়ার অদম্য ইচ্ছা শক্তির এই মদন কুমার দাস অশ্রু সজল চোখে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে নজরুল ইসলাম তোফাকে বলেন, শৈশবে তিনি কয়েক দিন না খেয়েই স্কুল করেছে আজও তার না খেয়ে থাকতে হয়।
অঙ্কন বিদ্যায় ভগবানের এক অপার মহিমা নিহিত রয়েছে বলেই দরিদ্রতার কশাঘাতে জন্ম লগ্নেই মূর্তি গড়া এবং ছবি অঙ্কনের নেশা পেয়ে বসে তার। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা শিল্পের প্রতি আগ্রহ। মাঠির পুতুল, পাখী তাছাড়াও ঘরে রাখা নানান রংয়ের শো পিস তৈরি করে রদ্রে শুকিয়ে হাট বাজারে এবং মেলায় বিক্রি করে কষ্টে শিষ্টে পড়া-শুনার খরচ চালিয়ে যেতে শুরু করে। নিজের খরচ নিজের উপার্জন থাকলে হয় নছেৎ নয়। বন্ধুরা পেট পুরে খেয়ে টিফিন নিয়ে চমৎকার স্কুল ড্রেস পরিধান করে আনন্দঘন পরিবেশে স্কুলে যায়। আর সে সময় মদন কুমার ক্ষুদার্থ অবস্থায় একমাত্র পুরনো শার্ট ও প্যান্ট পরে স্কুলে যেত। সবাই টিফিন খাওয়া শুরু করলে মদন একের পর এক পাঠ্য বইয়ের পাতা শব্দ করে উল্টিয়ে চলতো। বন্ধুরা তাকে খুব ভালোবাসতো বলেই সবাই দু’এক মুঠো করে ভাত দিত, মদন তা খেত। মেধাবি ছাত্র হওয়ায় স্কুল শিক্ষক তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মঞ্চ সজ্জার কাজ গুনোধর মদন কুমার ছাড়া অন্য কেউ করতে পারতো না। শিক্ষকদের উৎসাহে কমার্শিয়াল আর্ট কাজে তিনি নিজস্ব প্রতিভায় মনস্থির করেন। কিন্তু তার বড় দুই দিদির বিয়ের বয়স হওয়ায় যা উপার্জন তা একবারেই শেষ হয়ে যায়। বড় দিদি কুমারী জয়ন্তী রাণী লেখাপড়া জগৎ আদৌ চোখেই দেখেনি এবং দ্বিতীয় দিদি মাধবী রাণী পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কোন ভাবে লেখা পড়ার সুযোগ পেরেছে। কিন্তু হতদরিদ্র পরিবারে মোটেও শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব নয়। তাদের বিয়েও হয় মোটা অংকের যৌতুক দিয়ে। কৃষক বাবার সাধ্যের মধ্যে ছিলনা দুই মেয়ের বিয়ে দেয়া। বাবা শ্রী মরু চন্দ্র দাস পেশায় একজন দিনমজুর কৃষক, অন্যের জমিতে কাজ করে কত টাকাই বা পায়। তার মা শ্রী মতি মনোরানী দাস গৃহিণী তবুও বাবার সঙ্গে কাজে যেত। সংগ্রামী মদন কুমারের এই নিজ গল্প শৈশবে দিকে না ফিরলে অপূর্ণই রয়ে যাবে।
মদন কুমার যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন মা, বাবা ও বড় দু’বোনের সঙ্গে অন্যের বাড়িতে দিনমজরি কাজে যেত। অশিক্ষিত পরিবারের ছেলে শৈশবে বাবা-মার সঙ্গে কামলা দিত কিন্তু ছোট ছেলে বলে পূর্ণ মজুরি পেত না। আবার মদন সুযোগ পেলেই পুঁজা মন্ডবে যেত। নিজ প্রামে হিন্দু বাড়িতে পূজা মন্ডবে মূর্তি তৈরীর কারিগরদের পাশে গিয়ে তাদের শৈল্পিক নির্মাণ কৌশল দেখতো। ঢাক ঢোলের তালে ছন্দে যে সময় নিজেকে আনন্দিত রাখার কথা সেসময় মূর্তি গড়ার আগ্রহ তার সুপ্ত মনে জাগ্রত হয়। কারণ বাবা মা ও দু’বোনের সঙ্গে দিনমজুরির ফাঁকে ফাঁকে ক্ষেত খামারে নরম মাটি দিয়ে পুতুল,পাখী এবং স্বপ্নের বাড়ি মনের অজানতে বানিয়ে ফেলতো।লেখাপড়ায় তার প্রচুর শখ ছিল শৈশব কাল থেকেই,পালিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাবার অনেক মার খেয়েছে ভুলতে পারবে না মদন। কারণ, বাবার সঙ্গে পরের জমিতে কাজ না করলে পেটে দু’মুঠো ভাত আদৌ কপালে জুটবেনা। আজও কলেজ পড়ুয়া মদন কুমার দাস নাটর জেলার সিংড়া থানার ১১ নং সাতারদিঘী ইউনিয়নের পাওটা গ্রাম থেকে প্রতিদিন রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শৈল্পিক চেতনায় এসে ক্লাস করে। নিজ জন্ম স্থানে তার কিছু উপার্জন হয় বলেই এমন কষ্ট তাকে করতে হয়। পুষ্টি হীনতায় রোগা গ্রস্থ মদন যা উপার্জন করে তা অবশ্যই যাতায়াতে খরচ হয়। বৃদ্ধ বাবা মা সঠিক দু’বেলা খাবার দিতে পারে না। গ্রামে তার মার সঙ্গে নকসী কাঁথা সেলাই করে হাট-বাজারে বিক্রি করেও সংসারের অভাব দূর করা তার হয় না। এস এস সি পাশ করতে হলে প্রাইভেট পড়া অতিব জরুরী, তার মার একটি মাত্র আধি বা ধার নেয়া ছাগল বিক্রি করে ছাগলের মালিককে অর্ধেক টাকা দেবার পরও বাঁকি টাকায় ঠিক মতো প্রাইভেই হয়নি তার। বাঁচতেই যখন হবে কষ্টকে নিত্য সঙ্গি করে দু’টি শার্ট ও প্যান্ট পরে ইজ্জত ঢেঁকে এসএসসি পাশ করে। এলাকার কতজনের যে পা ধরে কেঁদেছে লেখাপড়ার খরচ চেয়ে ইয়াত্তা নেই। কোন একটি দিন না কেঁদে পার হতো না। এমন কথা নজরুল ইসলাম তোফার নিকট বলতে বলতে অঝর নয়নে কাঁদছিল চারুকলা পড়ুয়া মদন কুমার দাস। আজ ছবি আঁকবে কাগজ নেই, মন গুমরে গুমরে কাঁদে শিল্পচর্চা জন্য, কার্টিজ পেপারের পরিবর্তে নিউজ পেপারে ছবি এঁকে কতটুকুই বা নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলে সম্ভব হয়। এমন হাজারো অপূর্ণতা নিয়ে রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেখা দেয় অসুস্থতা।চারুকলা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক মহোদয়দের মন তুষ্ট করাতে পারে না সেটাও সে বুঝতে পারে। তবুও থেমে থাকার ছেলে নয় উদীয়মান শিল্পী হবার আশা আকাংঙ্খায় রত সংগ্রামী মদন কুমার দাস। শিল্পশৈলীর ভাষা তার রপ্ত চাই চায়ি। প্রামে তার এক বন্ধুর ভাইয়ের শুভ বিবাহতে একাই তিন রাত্রি জেগে আলপনা করে এবং ফুল সজ্জার আলোক উজ্জ্বল বাসর ঘর সাজিয়ে মোটা অংকের কিছু টাকা বন্ধুর বাবা খুশি হয়ে দিয়েছিল। সে টাকার সঙ্গে তার বাবার কিছু টাকা একত্রিত করে আর্ট কলেজে ভর্তি হয়। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী এখনও কিছু মানুষ আছে তারা এমন করে সাহায্য করলে আবশ্যই লেখা পড়া শেষে ভালো একজন শিল্পী হতে পারবে। তিনি হিন্দু জাতীর প্রতি কটাক্ষ ছোড়ে না দিয়েই নরম সুরে বলেন আজ কেউ সাহায্য করছে না তাকে কিন্তু হাজারো কষ্টে মাঝেও একদিন না একদিন শিল্পী হবেন এমন আশা পোষন করেন। গ্রাম সহ সকল পূজা মন্ডবে মা দূর্গা মূর্তি বা অন্যান্য মূর্তি নির্মাণের স্বপ্নে বিভর তিনি। নূন্যতম শিল্প বিদ্যার শুরুতেই ভাস্কর্য নির্মাণ কৌশল কিছুটা হলেও আয়ত্তে আসতে শুরু করেছে তার। তিনি শিক্ষকদের প্রতি প্রদ্ধা রেখে বলেন, রাজশাহী আর্ট কলেজের অনেক শিক্ষক তাকে চরম ভালোবাসে। নাটর থেকে প্রতি কলেজ করতে ১৮০ টাকা খরচ হয় তার। যেদিন টাকা থাকেনা সেদিন কলেজ করতে পারেনা। কাকে জানাবে মনের সত্যি কথা গুলো। আজ তার সঙ্গে কথা বলার সময় শরীর কাঁপছিল। জিগ্গেস করে জানা গেল, তিনি দুপুর বেলা শুধু খেয়েছে সারা রাত্রি না খেয়েই নাটর থেকে ভোরে রাজশাহী উদ্দ্যেসে রওনা দিয়েছে ক্লাস করার জন্য। কলেজ করে ফেরার পথে প্রতিদিন রাজশাহীর কালাই রুটি ১৫ টাকায় এক পিস ক্রয় করে কাঁচা ঝাল দিয়ে খেয়ে নাটর যান। এই খাবারই তার মোটা খাবার, প্রতিদিনের এমন খাবার খেয়ে অপুষ্টি জনিত রোগ সহ কোষ্টকাঠিন্য রোগে আক্রান্ত প্রায়। নিরুপাশ কি করবেন তিনি, কত কষ্টই বা সহ্য করবেন। লজ্জা সরম ত্যাগ করে তিনি আজ সাহায্যে হাত প্রসারিত করেছে। তার সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য রয়েছে বন্ধু দেয়া এই ০১৭৩৭২২৯৬৬৮ নম্বর সহ পুরনো মুঠোফোন। এমন হতদরিদ্র জীবনের শুধুই চাওয়া একটু লেখা পড়ার খরচ। এমন জীবন আলোকিত হোক সাংবাদিক নজরুল ইসলাল তোফার আশির্বাদ সহ গভীর ভাবে চাওয়া।

FB_IMG_1493581177909 FB_IMG_1493743805970 FB_IMG_1493744070298 FB_IMG_1493744293985 FB_IMG_1493744443556

 

সিডর/শুক্রবার, ৫ মে ২০১৭ ইংরেজি